স্টাফ রিপোর্টার 

ভালোবাসার সম্পর্কের টানা চার বছর পর বিয়ে করেছিলেন। সংসার ও স্ত্রীর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা ভেবে নিজের পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে কিনে দিয়েছিলেন ৩২ লাখ টাকা মূল্যের ফ্ল্যাট। তবে অভিযোগ উঠেছে, ফ্ল্যাট হাতিয়ে নেওয়ার পরও পরকীয়ায় জড়িয়ে বাসা থেকে নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার ও সন্তানকে নিয়ে চলে গেছেন স্ত্রী। সব মিলিয়ে প্রায় ৬১ লাখ টাকার সম্পদ হারিয়ে এখন দিশাহারা ভুক্তভোগী কলেজশিক্ষক।

​ঘটনাটি ঘটেছে কুমিল্লার সদর উপজেলায়। প্রতারণার শিকার শিক্ষক মো. ইকবাল হোসেন কুমিল্লা সদর উপজেলার ইবনে তাইমিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী শিক্ষক। স্ত্রীর প্রতারণা ও পরকীয়ার শিকার হয়ে আদালতে মামলা দায়ের করলে বিষয়টির তদন্তভার দেওয়া হয় জেলা গোয়েন্দা শাখাকে (ডিবি)। তদন্ত শেষে গোয়েন্দা পুলিশ ইকবাল হোসেনের স্ত্রী ফাহিমা আক্তারসহ সাতজনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা পেয়ে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে।

​আদালতে দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী অভিযুক্ত অন্য ব্যক্তিরা হলেন—ফাহিমা আক্তার (২৫), তাঁর বাবা মোহাম্মদ সেলিম (৫২), মা লুৎফুন নাহার ওরফে লাভলী (৪২), ভাই ফারহান হোসেন (২৩), চাচি খাদিজা বেগম ওরফে রুমা (৪৩), দাদি অহিদা বেগম (৭৩) এবং তদন্তে নতুন করে যুক্ত হওয়া ফাহিমার পরকীয়া প্রেমিক মো. রেদোয়ান আহমেদ (২৫)। প্রতিবেদনে আসামিদের বিরুদ্ধে বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণা, ব্যভিচার, চুরি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও অপরাধে সহায়তার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

​মামলার এজাহার ও ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, ফাহিমা আক্তারের পৈতৃক বাড়ি চাঁদপুরের হাজিগঞ্জ উপজেলার এন্নাতলী গ্রামে হলেও পরিবারসহ তিনি কুমিল্লা শহরে ভাড়া বাসায় থাকতেন। পরিচয়ের সূত্রে তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং ২০২১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পারিবারিকভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর থেকে ফাহিমা ও তাঁর পরিবার ইকবালের ওপর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে কুমিল্লা শহরে ফ্ল্যাট কিনে দেওয়ার চাপ সৃষ্টি করে। স্ত্রীর চাহিদা মেটাতে বাধ্য হয়ে ২০২২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার দক্ষিণ দুর্গাপুর এলাকার ‘আইডিয়াল প্যালেস’-এ ৩২ লাখ ২৬ হাজার টাকায় ১১৩০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট ফাহিমার নামে কিনে দেন ইকবাল।

​ফ্ল্যাট কিনে দেওয়ার পরও ইকবালের পারিবারিক জীবনে শান্তি ফেরেনি। অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ২৯ অক্টোবর ইকবাল যখন কলেজে পাঠদানে ব্যস্ত ছিলেন, তখন ফাহিমা ভাড়া বাসা থেকে নগদ ৫ লাখ টাকা, আনুমানিক ২৪ লাখ টাকা মূল্যের ১২ ভরি স্বর্ণালংকার ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে চম্পট দেন। সঙ্গে নিয়ে যান তাঁদের চার বছরের সন্তান ইরফানকেও।

​তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের জেরে ফাহিমা এ ঘটনা ঘটিয়েছেন। পরকীয়া প্রেমিক মো. রেদোয়ান আহমেদ ঘটনার সময় দেশে থাকলেও বর্তমানে সার্বিয়ায় অবস্থান করছেন। এছাড়া পরকীয়ার প্রতিবাদ করায় গত ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার একটি হোটেলে ডেকে নিয়ে ইকবালকে ভয়ভীতি দেখিয়ে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগও প্রমাণিত হয়েছে।

​গোয়েন্দা পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা নাজিউল ইসলাম সিসিটিভি ফুটেজ, ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও সাক্ষীদের বক্তব্য পর্যালোচনা শেষে আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৬, ৪২০, ৪৯৭, ৩৮০, ৫০৬ ও ১০৯ ধারায় অপরাধের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

​এদিকে ইকবাল হোসেনকে চাপে রাখতে ফাহিমা আক্তার একটি মিথ্যা যৌতুক মামলা দায়ের করেছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। উক্ত মামলায় ইকবাল আদালত থেকে ইতোমধ্যে স্থায়ী জামিন পেয়েছেন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর ফাহিমার পক্ষ থেকে একটি তালাকনামার নোটিশও পান ইকবাল।
​এ বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে ফাহিমা আক্তারের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তবে তাঁর মা লুৎফুন্নাহার বলেন, “ফ্ল্যাট ও টাকা নিয়ে আসার কোনো প্রমাণ কি তাদের কাছে আছে?” এই বলেই তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

​সর্বস্ব হারানো শিক্ষক ইকবাল হোসেন ক্ষোভ ও কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, “ভালোবাসার সম্পর্কের সুবাদে আমি উনাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করেছিলাম। কিন্তু আজ আমি সম্পূর্ণ প্রতারিত ও নিঃস্ব। আমি কেবল আদালতের কাছে সঠিক বিচার চাই।”